সৌদি আরব থেকে ইউরোপ যেতে কত টাকা লাগে
“সৌদি থেকে ইউরোপ যেতে কত লাগবে?” এই প্রশ্নটা এখন প্রায় প্রতিটি প্রবাসী পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার গ্রুপেই ঘুরছে।
যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশি পরিবারগুলোর অনেকেরই স্বজন সৌদিতে কর্মরত, আর তারা এখন ইউরোপের সুযোগ খুঁজছেন।
সমস্যা হলো, কেউ বলে দুই লাখ টাকা লাগে, কেউ বলে আট লাখ।
দুটোই আসলে সত্যি, কারণ খরচ পুরোপুরি নির্ভর করে কোন পথে যাওয়া হচ্ছে তার ওপর।
এই লেখায় পরিস্থিতিভেদে প্রকৃত খরচের একটা স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরা হলো।
খরচ নির্ভর করে কোন পথে যাচ্ছেন তার ওপর
সৌদি আরব থেকে ইউরোপে যাওয়ার তিনটি প্রধান পরিস্থিতি আছে, আর প্রতিটির খরচ একেবারে আলাদা।
পরিস্থিতি ১: নিজে নিয়োগকর্তা খুঁজে সরাসরি আবেদন।
এক্ষেত্রে শুধু সরকারি ফি, কাগজপত্র প্রস্তুতি ও ভ্রমণ খরচ লাগে। মধ্যস্বত্বভোগী নেই বলে খরচ সবচেয়ে কম।
পরিস্থিতি ২: লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন।
এজেন্সি নিয়োগকর্তা খুঁজে দেয়, কাগজপত্র প্রস্তুত করে এবং পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। সুবিধার বিনিময়ে বড় অঙ্কের সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়।
পরিস্থিতি ৩: পরিবার পুনর্মিলন বা স্টাডি ভিসা।
পরিবারের কেউ ইউরোপে বৈধভাবে থাকলে এই পথে যাওয়া তুলনামূলক কম খরচে সম্ভব, তবে আবেদনকারীর যোগ্যতার শর্ত ভিন্ন।
তিন পরিস্থিতির খরচের তুলনা
পরিস্থিতি,আনুমানিক মোট খরচ,সময়কাল
- সরাসরি নিয়োগকর্তা/এমব্যাসির মাধ্যমে
১,৫০,০০০ – ২,৫০,০০০ টাকা
৩-৫ মাস - লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সির মাধ্যমে
৩,৫০,০০০ – ৬,০০,০০০ টাকা
৪-৬ মাস - পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা
৮০,০০০ – ১,৫০,০০০ টাকা
৩-৬ মাস
লক্ষ করুন, এজেন্সির মাধ্যমে গেলে খরচ প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেড়ে যায়।
তাই যাদের ভাষাগত দক্ষতা ও প্রক্রিয়াগত ধৈর্য আছে, তাদের জন্য সরাসরি আবেদনই সবচেয়ে লাভজনক।
খরচের খাতভিত্তিক বিস্তারিত হিসাব
কোন খাতে কত টাকা যাচ্ছে, তা জানা থাকলে বাজেট করা সহজ হয়।
খরচের খাত ও আনুমানিক পরিমাণ (টাকায়)
- ভিসা ফি (এমব্যাসি/কনস্যুলেট)
২০,০০০ – ৪০,০০০ টাকা - ওয়ার্ক পারমিট প্রসেসিং ফি
৩০,০০০ – ৬০,০০০ টাকা - ডকুমেন্ট অ্যাটেস্টেশন ও ট্রান্সলেশন
২০,০০০ – ৩৫,০০০ টাকা - মেডিকেল টেস্ট ও স্বাস্থ্য বীমা
১৫,০০০ – ২৫,০০০ টাকা - সৌদি থেকে ইকামা বাতিল ও এক্সিট ভিসা
১০,০০০ – ২০,০০০ টাকা - বিমান টিকিট (সৌদি থেকে ইউরোপ)
৪০,০০০ – ৮০,০০০ টাকা
এই ছয়টি খাত মিলিয়েই সরাসরি আবেদনের মোট খরচ তৈরি হয়।
এজেন্সি ব্যবহার করলে এর সাথে আরও ২,৫০,০০০ থেকে ৪,৫০,০০০ টাকা সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়।
অনেকে যে লুকানো খরচগুলো হিসাবে রাখেন না
শুধু ভিসা ফি আর টিকিটের হিসাব করলেই পুরো বাজেট সম্পূর্ণ হয় না। কয়েকটি খরচ প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয়।
দ্বিতীয়বার আবেদনের খরচ।
কাগজপত্রে ভুল থাকলে বা প্রথম দফায় ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে পুনরায় আবেদনের পুরো ফি নতুন করে দিতে হয়।
সৌদিতে অপেক্ষার সময়ের খরচ।
ভিসা প্রক্রিয়াকালীন সৌদিতে থাকা-খাওয়ার খরচ চলতেই থাকে, বিশেষ করে ইকামা নবায়নের প্রয়োজন হলে বাড়তি খরচ যোগ হয়।
ইউরোপে পৌঁছানোর পরের প্রাথমিক খরচ।
প্রথম মাসের বাসাভাড়া, খাবার ও স্থানীয় পরিবহন খরচের জন্য হাতে অতিরিক্ত অর্থ রাখা উচিত।
ট্রান্সলেশন ও নোটারির বাড়তি খরচ।
কিছু দেশে সব কাগজ নির্দিষ্ট ভাষায় নোটারিকৃত অনুবাদ ছাড়া গ্রহণযোগ্য হয় না, যা অনেকেই শুরুতে হিসাবে রাখেন না।
এই লুকানো খরচগুলো ধরলে মূল বাজেটের সাথে আরও ৩০,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকা যোগ করে রাখা বাস্তবসম্মত।
সৌদি থেকে ইউরোপ যেতে কত লাগবে খরচ কমানোর কিছু বাস্তব উপায়
নিজে নিয়োগকর্তা খুঁজুন।
লিংকডইন বা ইউরোপীয় দেশের সরকারি জব পোর্টালে সরাসরি আবেদন করলে এজেন্সি ফি বাঁচে।
একাধিক এজেন্সির অফার তুলনা করুন।
একই দেশের একই খাতের জন্য বিভিন্ন এজেন্সির চার্জে বড় পার্থক্য থাকতে পারে।
কাগজপত্র নিজে গুছিয়ে রাখুন।
অ্যাটেস্টেশন ও ট্রান্সলেশনের কাজ নিজে করালে এজেন্সির মধ্যস্বত্ব খরচ কমে।
একবারে পুরো টাকা না দিয়ে ধাপে ধাপে পরিশোধ করুন।
এতে আর্থিক ঝুঁকি কমে এবং প্রতারণার সম্ভাবনাও কমে যায়।
সৌদি থেকে ইউরোপ যেতে কত লাগবে কোন দেশে খরচ তুলনামূলক কম
সব ইউরোপীয় দেশে খরচ সমান নয়।
রোমানিয়া ও পোল্যান্ডে প্রক্রিয়াগত খরচ তুলনামূলক কম, কারণ ভিসা ফি কম এবং প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হয়।
পর্তুগাল ও ইতালিতে প্রক্রিয়া কিছুটা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সামগ্রিক খরচ কিছুটা বেশি পড়ে।
মাল্টার ক্ষেত্রে দূতাবাস না থাকায় নয়াদিল্লিতে ইন্টারভিউয়ের জন্য বাড়তি ভ্রমণ খরচ যুক্ত হতে পারে।
সৌদি থেকে ইউরোপ যেতে কত লাগবে দালাল ও প্রতারণা এড়ানোর সংক্ষিপ্ত চেকলিস্ট
- এজেন্সির লাইসেন্স বিএমইটির ওয়েবসাইটে যাচাই করুন
- “নিশ্চিত ভিসা” বা “স্পট ভিসা” প্রতিশ্রুতি থেকে দূরে থাকুন
- অগ্রিম বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার আগে লিখিত চুক্তি নিন
- প্রতিটি লেনদেনের রসিদ সংরক্ষণ করুন
- অবৈধ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার প্রলোভনে কখনো পা দেবেন না

প্রবাসী পরিবারের জন্য বাজেট পরিকল্পনার পরামর্শ
যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পরিবারগুলো যখন সৌদিতে থাকা স্বজনের ইউরোপযাত্রায় আর্থিক সহায়তা করেন, তখন পুরো প্রক্রিয়ার আগে একটি স্পষ্ট বাজেট ঠিক করে নেওয়া ভালো।
মূল খরচের সাথে অন্তত ২০ শতাংশ বাড়তি রেখে পরিকল্পনা করলে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতেও চাপ কম পড়ে।
রেমিট্যান্স পাঠানোর সময় সবসময় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করুন এবং প্রতিটি ধাপের প্রমাণ হাতে রাখুন।
সৌদি থেকে ইউরোপ যেতে কত লাগবে প্রায়জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: সৌদি আরব থেকে ইউরোপ যেতে সর্বনিম্ন কত টাকা লাগে?
উত্তর: সরাসরি নিয়োগকর্তার মাধ্যমে আবেদন করলে সর্বনিম্ন দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব।
প্রশ্ন: এজেন্সি ব্যবহার করলে খরচ কতটা বাড়ে?
উত্তর: সাধারণত দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেড়ে যায়, কারণ এজেন্সি সার্ভিস চার্জ হিসেবে আড়াই থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত নিতে পারে।
প্রশ্ন: লুকানো খরচ এড়াতে কী করা উচিত?
উত্তর: মূল বাজেটের সাথে অন্তত ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকা বাড়তি রেখে পরিকল্পনা করা উচিত, যাতে পুনরায় আবেদন বা অপেক্ষার সময়ের খরচ সামলানো যায়।
প্রশ্ন: কোন দেশে যাওয়ার খরচ সবচেয়ে কম?
উত্তর: সাধারণত রোমানিয়া ও পোল্যান্ডে প্রক্রিয়াগত খরচ তুলনামূলক কম।
প্রশ্ন: পুরো টাকা একবারে পরিশোধ করা কি নিরাপদ?
উত্তর: না, ধাপে ধাপে অর্থ পরিশোধ করাই নিরাপদ, বিশেষ করে অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ নিশ্চিত হওয়ার আগে বড় অঙ্কের টাকা না দেওয়াই ভালো।
সৌদি থেকে ইউরোপ যেতে কত লাগবে শেষ কথা
সৌদি আরব থেকে ইউরোপে যাওয়ার খরচ কোনো একক সংখ্যা নয়, বরং নির্ভর করে কোন পথ বেছে নিচ্ছেন তার ওপর।
সরাসরি আবেদন করলে খরচ সবচেয়ে কম, এজেন্সি ব্যবহার করলে বেশি।
লুকানো খরচ হিসাবে রাখা এবং প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকাই সবচেয়ে বড় সাশ্রয়ের উপায়।
যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রবাসী পরিবারগুলো এই তথ্য সৌদিতে থাকা স্বজনদের সাথে শেয়ার করলে সঠিক বাজেট পরিকল্পনা করা সহজ হবে।
বাংলাদেশের সব ধরনের সরকারি ও বেসরকারি চাকুরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার সময়সূচী এবং ফলাফল সবার আগে জানতে নিয়মিত ভিজিট করুন ওয়েবসাইট aijobbd.com অথবা aijobsbd.com।
