গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তালিকা
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তালিকা “গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তালিকা” লিখে সার্চ করলে অনেক সাইটে নাম ও ঠিকানার লম্বা তালিকা দেখা যায়।
কিন্তু একটি জিনিস প্রায়ই চোখে পড়ে না। তালিকাগুলোর বেশিরভাগই পুরনো। কারণ এই শিল্পে কারখানা খোলে, বন্ধ হয়, হাত বদলায়, নাম বদলায়।
এর বাস্তব উদাহরণ সংবাদেই আছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী সাত মাসে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ৬২ হাজার কর্মী কাজ হারিয়েছেন। তাই কোনো নামের তালিকা আজ সঠিক হলেও কয়েক মাস পরে ভুল হতে পারে।
এই লেখায় আমি আপনাকে কোনো পুরনো নামের ভিড় দেব না। বরং দেখাব, কোন অঞ্চলে কত কারখানা আছে, নির্ভরযোগ্য তালিকা কোথায় পাবেন এবং কোনো কারখানা সত্যিই বৈধ কি না, তা কীভাবে যাচাই করবেন।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানা কোথায় কোথায় কেন্দ্রীভূত?
দেশের পোশাক কারখানা কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। সংবাদে বারবার যেসব এলাকার নাম আসে:
- গাজীপুর: টঙ্গী, কোনাবাড়ী, ভোগড়া, বোর্ডবাজার, জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর
- সাভার ও আশুলিয়া: ঢাকার পশ্চিমে
- নারায়ণগঞ্জ: ঢাকার পূর্ব-দক্ষিণে
- নরসিংদী ও ময়মনসিংহ: ঢাকার আশপাশের জেলা
- ঢাকা মহানগর: মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও অন্যান্য এলাকা
- চট্টগ্রাম ও খুলনা: আলাদা শিল্পাঞ্চল
শিল্প পুলিশের এক সূত্রে দেখা গেছে, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ ও খুলনা, এসব এলাকার শিল্প কারখানার হিসাব একসঙ্গে রাখা হয়। এতেই বোঝা যায়, এই ছয়টি অঞ্চল দেশের শিল্পের বড় অংশ ধারণ করে।
অঞ্চলভিত্তিক কারখানার সংখ্যা: কত কারখানা আছে?
সংখ্যা সূত্রভেদে বদলায়। কারণ কেউ শুধু রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা গোনে, কেউ সব শিল্প। নিচের তথ্যগুলো সংবাদ প্রতিবেদন থেকে।
গাজীপুর: প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী গাজীপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে নিবন্ধিত কারখানা ২,১৭৬টি। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি তৈরি পোশাক কারখানা, সংখ্যা ১,১৫৪টি। এই প্রতিবেদনটি কিছুটা আগের, তাই বর্তমান সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে।
আরেকটি সরকারি বার্তার সূত্র ধরে ২০২৪ সালের অক্টোবরে জানানো হয়, গাজীপুরে ৮৭১টি কারখানার মধ্যে মাত্র ২টি ছাড়া বাকিগুলো চালু ছিল।
সাভার ও আশুলিয়া: একই বার্তায় সাভার-আশুলিয়ায় মোট ৪০৭টি কারখানার কথা বলা হয়। অন্য একটি প্রতিবেদনে বিজিএমইএর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সাভার-আশুলিয়ায় সাড়ে চার শ তৈরি পোশাক কারখানা আছে।
নারায়ণগঞ্জ: সংখ্যা নিয়ে আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে নির্দিষ্ট অঙ্ক পাইনি।
কেন এত পার্থক্য? কারণ উৎসের মাপকাঠি আলাদা। বিজিএমইএ শুধু তাদের সদস্য কারখানা গোনে। সরকারি দপ্তর নিবন্ধিত বা পরিদর্শনকৃত সব কারখানা গোনে। আর কিছু ছোট কারখানা সদস্যতালিকার বাইরে থাকে। তাই সংখ্যা মেলাতে চাইলে প্রতিবার দেখুন, কোন সংস্থা কী গুনে বলছে।
নির্ভরযোগ্য তালিকা কোথায় পাবেন?
একটি যাচাইযোগ্য তালিকা চাইলে এই উৎসগুলো দেখুন।
১. বিজিএমইএ (বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন): তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন। সদস্য কারখানার তথ্য সাধারণত এদের কাছে থাকে।
২. বিকেএমইএ (বাংলাদেশ নিট গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন): নিট পোশাক কারখানার সংগঠন।
৩. বেপজা (বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ): রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) ভেতরের কারখানার জন্য।
৪. কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর: কারখানার নিবন্ধন, লাইসেন্স ও পরিদর্শনের তথ্যের জন্য সরকারি সংস্থা।
৫. কারখানা নিরাপত্তা ও টেকসই সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান: অনেক রপ্তানিমুখী কারখানা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদায় নিরাপত্তা পরিদর্শনের আওতায় থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকায় কারখানার নাম পাওয়া যেতে পারে।
মনে রাখবেন: প্রতিটি সংস্থার ওয়েবসাইটে কী কী তথ্য প্রকাশ হয়, তা সময়ের সঙ্গে বদলায়। আমি প্রতিটির ওয়েবসাইটের বর্তমান অবস্থা যাচাই করিনি। তাই সরাসরি দেখে নিন।
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তালিকা কিছু পরিচিত নাম: একটি সীমাবদ্ধ উদাহরণ
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে হা-মীম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, এপিলিয়ন গ্রুপ ও বেক্সিমকো গ্রুপের মতো বড় নাম পরিচিত। এগুলো সাধারণ জ্ঞানের ভিত্তিতে দেওয়া উদাহরণ।
এটি কোনো পূর্ণ বা র্যাংকিং তালিকা নয়। আমি এদের বর্তমান কারখানার সংখ্যা, অবস্থান বা শ্রমিকসংখ্যা যাচাই করিনি, তাই সেসব তথ্য দিচ্ছি না। কোনো কারখানায় কাজ বা ব্যবসা করতে চাইলে ওপরের উৎসগুলোতে নিজে যাচাই করুন।
কারখানা বৈধ কি না, তা যাচাইয়ের ছয়টি ধাপ
আপনি চাকরিপ্রার্থী হোন, ক্রেতা হোন বা সাপ্লায়ার, কোনো কারখানার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার আগে এই ছয়টি বিষয় দেখুন।
১. নিবন্ধন ও লাইসেন্স। কারখানার ট্রেড লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি নিবন্ধন (প্রযোজ্য হলে) ও কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের নিবন্ধন আছে কি না জানুন।
২. সংগঠনের সদস্যপদ। বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর সদস্য কি না, সংগঠনের কাছে জিজ্ঞাসা করে নিন।
৩. ভবনের নিরাপত্তা। রানা প্লাজা ধসের তের বছর পেরিয়েছে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে ভবন ধসে ১,১৩৫ জন শ্রমিক মারা যান। তাই ভবন ও অগ্নি নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুন।
৪. শ্রমিকদের অবস্থা। নিয়মিত বেতন, ছুটি ও ওভারটাইম মজুরি কেমন, তা কর্মরত শ্রমিকদের কাছ থেকে জানুন।
৫. ঠিকানা ও যোগাযোগ। কারখানার স্পষ্ট ঠিকানা ও অফিস আছে কি না দেখুন।
৬. সাম্প্রতিক খবর। বন্ধ হওয়া বা বেতন বকেয়ার খবর সংবাদে আছে কি না খুঁজুন।
কারখানার অস্থিরতা: ঝুঁকি যা আপনার জানা দরকার
পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও কারখানা বন্ধ নতুন নয়। কয়েকটি তথ্য:
- ২০২৪ সালের অস্থিরতার সময় গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় ২৪৭টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছিল।
- গাজীপুরে মহাসড়কে বিক্ষোভের কারণে যানজট ও কর্মবিরতির ঘটনা বহুবার ঘটেছে।
- ২০২৬ সালের মে মাসে গাজীপুর ও আশপাশে ভূমিকম্পের কারণে পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়।
- একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
এসব তথ্য কারখানা নির্বাচনে ঝুঁকি বোঝার জন্য। তবে একটি জায়গায় অস্থিরতা মানে সব কারখানায় সমস্যা নয়। প্রতিটি কারখানার অবস্থা আলাদা করে যাচাই করুন।
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তালিকা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য কারখানা বাছাইয়ের পরামর্শ
আপনি যদি কাজ খুঁজছেন, তাহলে শুধু কারখানার নাম নয়, কাজের পরিবেশ দেখুন।
- নিয়োগের সময় লিখিত নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র চান। শ্রম আইন অনুযায়ী এগুলো পাওয়ার কথা।
- বেতন কবে, কীভাবে দেওয়া হয়, তা আগে জানুন।
- মাতৃত্বকালীন ছুটি, সাপ্তাহিক ছুটি ও ওভারটাইমের নিয়ম জিজ্ঞাসা করুন।
- কাজের জায়গায় অগ্নি নিরাপত্তার ব্যবস্থা দেখুন।
- যাঁরা আগে সেখানে কাজ করেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনুন।

ক্রেতা ও সাপ্লায়ারদের জন্য পরামর্শ
আপনি যদি পোশাক কেনার বা সরবরাহের ব্যবসায় থাকেন, তাহলে নিচের বিষয়গুলো মনে রাখুন।
- কারখানা পরিদর্শন করে নিজে দেখুন, শুধু ছবি দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
- নিরাপত্তা ও সম্মতি সংক্রান্ত সনদ চান।
- অগ্রিম টাকা দেওয়ার আগে কারখানার পরিচয় ও আর্থিক অবস্থা যাচাই করুন।
- মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে চুক্তি করলে কারখানার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখুন।
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তালিকা সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
বাংলাদেশে মোট কয়টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে?
সংখ্যা সংস্থাভেদে আলাদা। কারণ কেউ রপ্তানিমুখী কারখানা গোনে, কেউ সব নিবন্ধিত কারখানা। নির্ভরযোগ্য সংখ্যা পেতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ বা কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য দেখুন।
গাজীপুরে কত গার্মেন্টস কারখানা আছে?
একটি পুরনো প্রতিবেদনে ১,১৫৪টি তৈরি পোশাক কারখানার কথা বলা হয়েছে। অন্য একটি সূত্রে ৮৭১টির কথা আছে। সংখ্যা সময় ও মাপকাঠির ওপর নির্ভর করে।
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তালিকা কোথায় পাব?
বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বেপজা ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে।
বন্ধ কারখানার তালিকা কোথায় দেখব?
সংবাদ প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের ঘোষণায়।
কারখানায় চাকরির জন্য কি টাকা দিতে হয়?
না। চাকরির জন্য অগ্রিম টাকা চাইলে তা প্রতারণা।
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তালিকা শেষ কথা
গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তালিকা একবার তৈরি করে রেখে দেওয়ার জিনিস নয়। এটি নিয়মিত হালনাগাদ করতে হয়। নির্ভরযোগ্য সংস্থার তথ্য দেখুন, কারখানার নিবন্ধন ও নিরাপত্তা যাচাই করুন এবং পুরনো তালিকার ওপর অন্ধ বিশ্বাস রাখবেন না।
আপনি শ্রমিক, ক্রেতা বা সাপ্লায়ার, যা-ই হোন, যাচাই করাই আপনার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
বাংলাদেশের সব ধরনের সরকারি ও বেসরকারি চাকুরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার সময়সূচী এবং ফলাফল সবার আগে জানতে নিয়মিত ভিজিট করুন ওয়েবসাইট aijobbd.com অথবা aijobsbd.com।
